কিশোরগঞ্জে কৃষি ব্যাংকের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা শত শত কৃষক

মাফি মহিউদ্দিন, কিশোরগঞ্জ(নীলফামারী)প্রতিনিধিঃ নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক শাখা থেকে শত শত কৃষকের নামে ঋন হালনাগান (রিকভারী) ও নতুন ঋন করার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। ফলে ব্যাংকের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ঋণ গ্রহিতা কৃষকগণ। এসব ঋণ গ্রহিতারা জানেননা তাদের নামে ব্যাংকে ঋণের পরিমান কত এমনকি তাদের কাছে নেই কোন কাগজপত্রাদি। ব্যাংকের অভ্যান্তরিন এক অডিট আপত্তিতে বিষয়টি ধরা পড়েছে।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক নীলফামারী কিশোরগঞ্জ উপজেলা শাখা অফিস সুত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে এ শাখা থেকে ৭৬৯ জন ঋণ গ্রহিতাকে ৫ কোটি ১৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা ঋন বিতরন করা হয়। এর মধ্যে ১৫ জন ব্যাবসায়ীকে সিসি লোন দেওয়া হয় ৭৪ লাখ ৩০ হাজার। বাকি ৪ কোটি ৪৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা ৭৫৪ জন কৃষকদের মধ্যে বিতরন করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৬৯১ জন ঋণ গ্রহিতাকে ৫ কোটি ৪০ লাখ ৬১ হাজার টাকা ঋণ বিতরন করা হয়। এর মধ্যে ১৭ জন ব্যাবসায়ীকে সিসি লোন দেওয়া হয় ৭২ লাখ ৪০ হাজার, বাকি ৪ কোটি ৬৮ লাখ ২১ হাজার ৬৭৪ জন কৃষকের মধ্যে বিতরন করা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে এখন পর্যন্ত ২৮১ জনের নামে ২ কোটি ৯৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা ঋন বিতরন করা হয়। এর মধ্যে ২০ জন ব্যাবসায়ীর নামে সিসি লোন ৮৭ লাখ ৫০ হাজার এবং ২৬১ জন কৃষকের মধ্যে ২ কোটি ৫ লাখ ৬৩ হাজার টাকা বিতরন করা হয়।

সুত্রে জানা গেছে, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কিশোরগঞ্জ শাখায় ৪ জন ফিল্ড অফিসার থাকার কথা থাকলেও পদ গুলো শুন্য থাকায় সিনিয়র কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক একাই সব দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে যোগদানের পর ওই কর্মকতা প্রতিটি ইউনিয়নে দালাল নিযুক্ত করে দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন কৃষক ও ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ব্যাংকের তৎকালিন ম্যানেজার ফিরোজ মোহাম্মদ ফারুক সহ এসব ঋন বিতরন করেছেন। বর্তমানে তৎকালিন ব্যাংক ম্যানেজার ফিরোজ মোহাম্মদ ফারুক রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন।

গত সোমবার কৃষকের অভিযোগ ও সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কেশবা গ্রামের ইউছুফ আলীর ছেলে আজাহার আলী (৫২) বলেন, গত ২০১৬ সালে মার্চ মাসে ব্যাংকে ঋন করতে গেলে ব্যাংকের সুপার ভাইজার আব্দুর রাজ্জাক তাঁকে জানান তাঁর কাগজ পত্রে সমস্যা থাকায় তাঁকে ঋন প্রদান করা যাবেনা। তাই তিনি নিরুপায় হয়ে ব্যাংকের দালাল ফারুক আহম্মেদের সাথে যোগাযোগ করলে ফারুক আমাকে জানায়, আপনি চলে যান আপনার ঋনের ব্যাবস্থা আমি করব। কয়েকদিন পরে ফারুক আমাকে বলে আপনার নামে ৪০ হাজার টাকা ঋন হয়েছে। কিন্তু ওই দালাল ফারুক আমাকে প্রথম দফায় ১২ হাজার ও দ্বিতীয় দফায় ৮ হাজার টাকা দিয়ে বলে বাকি টাকা ব্যাংকে খরচ হয়ে গেছে। আমি অনেক কান্নাকাটি করলে সে বাকি টাকা তো দেয়নি এমনকি আমার ঋনের কাগজপত্র চাইলে সে গত দুই বছর যাবৎ কোন কাগজপত্র দিচ্ছেনা।

চাঁদখানা ইউনিয়নের দক্ষিন চাঁদখানা দহবন্দ গ্রামের স্বর্গীয় দেবেন্দ্র নাথ রায়ের ছেলে সেল্লাই চন্দ্র রায়(৪৫) বলেন, ২০০৯ সালে ব্যাংকে আমি ১০ হাজার টাকা ঋন করেছিলাম । ১০ হাজার টাকার মধ্যে আমি পেয়েছিলাম ৫ হাজার। পরে আবারো ব্যাংকের দালাল মোস্তফা আমাকে জানান, ব্যাংকের লোন পরিশোধ না করলে মামলা হবে তাই আবারো ২০১৭ সালে আমার নামে পুর্বের ঋণ হালনাগাদ করে ৩০ হাজার টাকা ঋণ করে আমাকে শুধু তিন হাজার টাকা দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমাকে কোন কাগজপত্র দেয় নি।।
একই গ্রামের মৃত্যু রহিমুদ্দিনের ছেলে মনজের আলী (৫৫)বলেন, বাবা আমি গরিব মানুষ আমার কোন জমিজাগা নেই । আমি অন্যের জমিতে বাস করি । ব্যাংকের দালাল আমাকে ডেকে নিয়ে আমার নামে ৩০ হাজার টাকা ঋন করে আমাকে শধু ৪ হাজার টাকা দিয়েছি। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকের ঋনের টাকা শোধ করার জন্য আমার উপর চাপ দিয়েছে আমি টাকা কই পাব। একই গ্রামের ভুক্তভোগী বেংকু বর্মন(৫৫) টন্না বর্মণ(৬০) আলতানুর রহমান(৪৮) আজগার আলী (৬২) সহ শত শত কৃষক ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

চাঁদখানা উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী লালমিয়া বলেন, আমার নামে ব্যাংকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সিসি লোন ছিল। আমার পারিবারিক সমস্যার কারনে সিলি লোনটি ৩ লাখ টাকা করার জন্য অফিসে গেলে ব্যাংক ম্যানেজার ও সুপারভাইজার বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে কালক্ষেপন করতে থাকে। পরে ব্যাংকের দালাল ছোট দুলালকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে লোনটি করেছি।
ব্যাংকের দালাল ফারুক হোসেন, দুলাল হোসেন, মোস্তফা তাদের প্রত্যেকের সাথে কথা বললে তারা বলেন, ব্যাংকের অফিসাররা সরাসরি টাকা না নিয়ে ঋন গ্রহিতাদের আবেদনের বিভিন্ন ভুল ধরেন। পরে ঋণ নিতে আসা কৃষকরা আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে আমরা কাজ করে দিলে তারা কিছু টাকা দেয়। এটা দোষের কি, আর সুপারভাইজার আব্দুর রাজ্জাক স্যার যে রেজওয়ান নামে এক ব্যাবসায়ীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতি হাজারের ২০ টাকা সুদ নিয়ে কৃষকদের লোন রিকভার করে দেন।

ব্যাবসায়ী রেজওয়ানের সাথে কথা বললে তিনি টাকা দিয়ে মুনাফা নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ব্যাংকে আমার সিসি লোন আছে সেই সুবাধে সুপারভাইজার আব্দুর রাজ্জাক টাকা নেয়। আমার পরে মুনাফাসহ দিয়ে দেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক শাখার ফিল্ড সুপার ভাইজার আব্দুর রাজ্জাকের সাথে কথা বললে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন। আমি ঋন বিতরনের নামে কোন কৃষকের কাছে টাকা নেইনি। কেউ যদি আমার কথা বলে টাকা নেয় সে দায় আমার নয়। তাছাড়া কোন কৃষককে আমি ঋন দিতে পারি ঋণ দেন ম্যানেজার।
তৎকালিন ব্যাংক ম্যানেজার ও বর্তমানে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক শাখার ম্যানেজার ফিরোজ মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ব্যাংকে কার বিষয়ে কোন আপত্তি এসেছে সেটা আপনি কেমন করে জানেন। এটাতো ব্যাংকের অভ্যান্তরিন বিষয় আপনি কে আপনাকে কেন বলবো। যান আপনার কি লেখার আছে লেখেন।

চাঁদখানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাফিজার রহমান হাফু বলেন, আমার ইউনিয়নের অনেক অসহায় দরিদ্র মানুষের নামে কৃষি ব্যাংক থেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে ব্যাংকের ঋন পরিশোদ করার জন্য শুনেছি।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কিশোরগঞ্জ শাখার ম্যানেজার আফজালুল হক চেীধুরীর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, আমি এ শাখায় গত ২০১৮ সালের ফেব্রæয়ারী মাসের ১৫ তারিখে যোগদান করেছি। পুর্বে কে কি অনিয়ম করেছে সে বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারবনা। কতজন কৃষকের ঋনের বিষয়ে অডিট আপত্তি এসেছে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে যে সমস্ত কৃষকের মধ্যে হালনাগাদ (রিকভারী) ঋণ বিতরন করা হয়েছিল তাদের মধ্যে থেকে কিছু কৃষকের নামে ব্যাংকের অভ্যান্তরিণ নিরীক্ষা দল কর্তৃক আপত্তি এসেছে বলে জানান।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের নীলফামারী জোনাল ম্যানেজার আমিনুল হকের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে কোন লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ আসলে ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

নীলফামারী ৪ আসনের সংসদ সদস্য শওকত আলী চৌধুরী বলেন, যে সমস্ত ব্যাংক কর্মকর্তা অসহায় দরিদ্র কৃষকের নামে ঋন দিয়ে টাকা উত্তোলন করে আতœসাৎ করেছে ওই সব ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক ব্যাংকের এজিএম ও ডিজিএম বরাবর অভিযোগ দিলে যদি তারা ব্যাবস্থা না নেয় তাহলে বিষয়টি আমি প্রয়োজনে সংসদে উপস্থাপন করব।