হৃদয় পুড়লে খাঁটি হয়, কিন্তু বস্তি পুড়লে?

টিবিটি মেট্রো: চোখ খুলেই দেখি রুমের আলো জ্বলে, বারান্দা থেকে কান্নার আওয়াজ আসে আর বাসার নীচ থেকে হৈ চৈ। লাফিয়ে উঠলাম। আমার বোন মা দুজনই কাঁদতেছেন। ভাবলাম বাচ্চাদের কিছু হয়েছে! বাসা ভর্তি বাচ্চা কাচ্চা। এমন হওয়া স্বাভাবিক। দৌড়ে বারান্দায় যাওয়াতেই চোখ ঝলসে গেলো। তাপে তাঁতিয়ে উঠেছে সব, বারান্দার গ্রিল, দরজা, ফুল গাছের টব… যা যা ছিলো সব।

বাসার সামনে ঝিল, ঝিলের ওপারে বস্তি। সেখানে ধাউ ধাউ করে আগুন জ্বলে। যখন কেবল তিন চারটা ঘরে আগুন জ্বলছিলো তখন ৩ টা ৪০ কিংবা ৫০ এর মত বাজে। আর চারটে বাজতে বাজতেই তা ছড়িয়ে পরলো চারদিকে।

বস্তির লোকজন দৌড়ে এসে উঠেছে বাসার ঠিক সামনের রাস্তায়। কান্নায়, আহাজারিতে কেমন যেন ভারী হয়ে গেছে চারপাশ। একটা যুদ্ধ-বিগ্রহ ভাব। সবাই যেন হন্যে হয়ে খুঁজছে কাউকে। যার সাথে যার দেখা হচ্ছে, কেবল জিজ্ঞেস করছে, ‘…আমার মেজো পোলাটাকে দেখছ?’

তখনো ফায়ার সার্ভিস আসে নাই। কেবল বস্তির লোকজন বালতি কিংবা এটা ওটাতে করে পানি দিচ্ছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। হওয়ার কথাও না। হবে কি করে? প্রায় একশো ফুট পর্যন্ত উঁচিয়ে ওঠা আগুনের কাছে এক বালতি পানি যেন নস্যি। আগুনের এক নিঃশ্বাসেই শুকিয়ে যাচ্ছে তা।

প্রায় ৫০ মিনিট পর ফায়ার সার্ভিস আসলো। কিন্তু কেমন যেন নিরুপায় মনে হলো তাদের। কেবল রাস্তার এ পাশ থেকে ও পাশে দৌড়াচ্ছে; আর হাঁপাচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিচ্ছু হচ্ছে না। সময়ের সাথে সাথে মানুষের কান্না বাড়লো। নীচ থেকে যেসব আহাজারী শুনলাম, তার মাঝে এক বৃদ্ধের জোড়ে জোড়ে চিৎকারে ছিলো, ‘বাবা ইদ্রিস, বাবা ইদ্রিস…’।

ধীরে ধীরে সকাল হলো। কিন্তু আগুন নিভলো না। নেভার কথাও না। চৈত্র মাস; সব শুকিয়ে ঝন ঝনে হয়ে আছে। এমন কি ঝিলের পানিও। একটু স্ফুলিঙ্গ উড়ে এসে কোথাও পরলেই, শুরু হচ্ছে নতুন আগুন। যখন আগুন এ ঘর থেকে ও ঘরে ছড়াচ্ছে, তখন কেবল দু একটা জায়গায় পানি ছিটাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস। অন্তত যেভাবে পানি দিচ্ছিলো, তাতে ছিটানো ছাড়া অন্য কিছু মনে হলো না।

সকালের দিকে আগুন নিজে নিজেই যেন নিস্তেজ হলো। ফায়ার সার্ভিস কেবল সরকারি বিদ্যুৎ অফিস, বড় বড় গার্মেন্টস আর বহুতল দালানের আশে পাশের আগুন নেভানো ছাড়া আর কিছু যেন করার পেলো না। কিংবা হয়ত তারা ধরে নিয়েছিলো বস্তি পুড়বেই। আর যে পুড়বে তাকে পুড়তে দেওয়া ভালো। তাদের রাস্তার এ পাশ থেকে ওপাশে দৌড়ে যাওয়া আসা আর গাড়ির সাইরেন শুনে মনে হলো ওনারা রোমান সম্রাট নিয়েরো। ওপাশে বস্তি পুড়ে শেষ। এ পাশে ওনারা কেবল বাঁশি বাঁজাচ্ছেন…। আর সাথে হাঁপাচ্ছেন।

সকালে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, রাস্তার দু ধারে মানুষজন সারি হয়ে বসে আছে। কেউ কেউ কথা বলছে, কেউ বা আবার বলছেও না। এদের মাঝে যিনি রাতে ‘বাবা ইদ্রিস, বাবা ইদ্রিস’ বলে ডেকেছেন, উনি আদৌ ইদ্রিসকে পেয়েছিলেন কি না, জিজ্ঞেস করতে মন চাইলো। কিন্তু পারা গেলো না। মাঝে মাঝে আপনি চাইলেও অনেক কিছুই পারবেন না, তার মাঝে এটা একটা।

আমি এই বস্তিটাকে ধীরে ধীরে বড় হতে দেখেছি। আগুনে পুড়তে দেখলাম। হয়ত ক’দিন পর এখানে বহুতল ভবন উঠতেও দেখবো। কারণ, বস্তিতে আগুন লাগলে সেখানে আর বস্তি ওঠে না, উঁচু দালান ওঠে…।

হৃদয় পুড়লে খাঁটি হয়, আর বস্তি পুড়লে উঁচু দালান। হিসেব সহজ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here